পর্যটন বিচিত্রা ডেস্ক
পাথরঘাটা
জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলা সদর থেকে ৫ কিমি. পূর্বে তুলসীগঙ্গা নদীর পশ্চিম পার্শ্বে প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষপূর্ণ এলাকার নাম পাথরঘাটা। প্রায় ৯ বর্গ কিমি. এলাকাজুড়ে অসংখ্য প্রাচীন কীর্তির মধ্যে মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ, খোদাই করা শিলালিপি, পোড়ামাটির ফলক, বিশাল গ্রানাইট পাথরের খণ্ডাংশ পাওয়া যায়। অনেক পাথরের উপস্থিতির জন্যই সম্ভবত এলাকাটির নাম পাথরঘাটা হয়েছে।
পাথরঘাটার মূল কেন্দ্রের মাত্র ১৮৩ মিটার (৬০০ ফুট) উত্তরে চার পাড় বাঁধানো প্রাচীনকালের একটি অগভীর জলাশয় আছে। তুলসীগঙ্গা নদীর উঁচু পাড় থেকে প্রায় ৫.৫০ মিটার (১৮ ফুট) নিচ পর্যন্ত পাথর দিয়ে বাঁধানো সিঁড়ি ও প্রাচীন ইমারতের ধ্বংসাবশেষের দৃশ্য চোখে পড়ে।
অনুমান করা যায়, তুলসীগঙ্গা নদী সৃষ্টির ফলে প্রাচীন এই বিশাল ইমারতগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পরবর্তীতে খ্রিষ্টান মিশনারি কর্তৃক পুকুরের পূর্ব পাড়ে আধুনিক ভবন নির্মাণের সময় অসংখ্য পুরাকীর্তি ও ভগ্নাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। বর্তমানে খ্রিষ্টান মিশনারি ভবনের মাত্র ২৭৫ মিটার (৯০০ ফুট) দূরে একটি ঐতিহাসিক মাজার ও একটি মন্দির আছে।
পাথরঘাটা প্রত্নস্থলের ইতিহাস সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের কয়েকটি খণ্ডাংশ এবং একটি কুষাণ রীতির দেবমূর্তির ওপর ভিত্তি করে পাথরঘাটাকে আদি ঐতিহাসিক যুগের বলে অভিহিত করা যায়। এখানে প্রাপ্ত কিছু প্রত্নবস্তু গুপ্ত, পাল এবং সেন আমলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান খ্রিষ্টান মিশনের পশ্চিমদিকে একই স্থানে ৯টি পুকুর ছিল বিধায় এ স্থানটির নাম হয়েছিল নওপুকুরিয়া। তবে বর্তমানে এখানে পুকুরের কোনো অস্তিত্ব নেই। ধারণা করা হয় এই নওপুকুরিয়াতেই ঐতিহাসিক পাথরঘাটার প্রাচীন প্রশাসনিক ও আবাসিক ভবন ছিল।
নিমাই পীরের মাজার
পাথরঘাটা নিমাই পীরের মাজারের পার্শ্বে একটি পাথরের দণ্ড পোঁতা আছে। এটা পীর সাহেবের আশা (লাঠি) হিসেবে পরিচিত। একটি পাথরের উপর উপবেশন করে তিনি একত্ববাদের বাণী প্রচার করতেন। এলাকাবাসীর মতে এটি পীর কেবলা নাসিরউদ্দিনের মাজার। তবে হিন্দু সম্প্রদায় এটিকে নিমাই পীরের দরগা বলে দাবি করে। প্রতিবছর বাংলা চৈত্র মাসের প্রথম সোমবার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া এখানে মাজার জিয়ারত উপলক্ষে ইসালে সওয়াব এবং মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
ইসালে সওয়াবের কয়েক দিন পর এখানে হাজার হাজার হিন্দু নরনারীর সমাবেশ ঘটে। এ উপলক্ষে এখানে এক বিরাট মেলা হয়। এটি পাথরঘাটার মেলা নামে পরিচিত। এখানে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বহু পাথর পড়ে থাকতে দেখা যায়। বলা হয়, নিমাই পীরের আস্তানা থেকে পাথরে বাঁধা একটি ঘাট ছিল এবং তুলসীগঙ্গা নদীর তীরে একটি পাথরের সেতু ছিল। সেতুটি প্রায় ৪৬ মিটার (১৫০ ফুট) দীর্ঘ ছিল। এটি বহু পূর্বে ভেঙে গেছে। চিহ্নস্বরূপ এখনো নদীর পূর্ব তীরে পাথর ও ইটের গাঁথুনি দেখা যায়।
বারো শিবালয় মন্দির
জয়পুরহাট শহরের ৪ কিমি. উত্তর-পশ্চিমে বেল আমলা গ্রামের পশ্চিমদিকে যমুনা নদীর পাড়ে একটি আয়তাকার চত্বর ঘিরে পাশাপশি সারিবদ্ধভাবে একই আকার ও স্থাপত্যশৈলীর ১২টি মন্দির অবস্থিত। বারো শিবালয় মন্দিরগুচ্ছ দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম তীর্থস্থান। এককোঠা ও একদুয়ার বিশিষ্ট প্রতিটি মন্দির একটি অপরিসর বর্গাকার ভূমি-পরিকল্পনায় নির্মিত। তবে এগুলোর কোনোটির চূড়ায় রয়েছে রেখদেউল শিখর, কোনোটির উপর আধখোলা ছাতাকার শিখর এবং কোনোটির উপর চার-পলাকার খর্বকায় শিখর।
প্রতিটি মন্দিরের ভেতর একটি করে শিবলিঙ্গ রয়েছে। তাই এই স্থানকে ‘বারো শিবালয়’ বলা হয়ে থাকে। অন্যান্য প্রাচীন কীর্তির মতোই মন্দিরগুলো চুন-সুরকি ও চেপ্টা ইটের তৈরি। দূর-দূরান্ত থেকে সারাবছরই ভক্তরা এখানে আসেন। এর প্রায় ৫০০ মিটার (১৬৪০ ফুট) দক্ষিণ-পশ্চিমে পাশাপাশি অনুরূপ ৫টি কালী মন্দির রয়েছে। এছাড়াও দক্ষিণ-পূর্বে এক কিমি. দূরে একটি হনুমান মন্দির রয়েছে।
হিন্দা-কসবা শাহী মসজিদ
জয়পুরহাট শহর থেকে ১৫ কিমি. দূরে হিন্দা-কসবা শাহী জামে মসজিদ ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা গ্রামে অবস্থিত। এই মসজিদটির অপূর্ব নির্মাণশৈলীর জন্য মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় মসজিদ হিসেবে সমাদৃত। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অনুকরণে নির্মিত পাঁচ গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটিতে কাচ, চীনামাটির টুকরা ও মোজাইক করা দেয়ালে মোগল স্থাপত্য শিল্পের অনুকরণে নানান রকম নকশা করা হয়েছে।
বাংলা ১৩৬৫ সালে (১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) বাগমারী পীর হিসেবে পরিচিত চিশতিয়া তরিকার অন্যতম পীর হজরত আব্দুল গফুর চিশতী (র.)-এর নির্দেশে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ১৫ মিটার (৫০ ফুট) এবং প্রস্থে ৭ মিটার (২৩ ফুট)। মসজিদের উত্তর পাশে ১২ মিটার (৪০ ফুট) উচ্চতাবিশিষ্ট একটি মিনার রয়েছে। মসজিদের পাঁচটি গম্বুজের মধ্যে মাঝেরটি বড়। সবগুলো গম্বুজ রড ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে রয়েছে শাহ সুলতান বখতির চারজন শিষ্যের মাজার।
গোপীনাথপুর মন্দির
জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলা সদর থেকে ৬ কিমি. পূর্বে গোপীনাথপুরে একটি অতি প্রাচীন মন্দির রয়েছে। এটি গোপীনাথ ঠাকুরের মন্দির নামে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, ১৫২০ থেকে ১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্ পূর্ণ গোপীনাথপুর ও গোপালপুর মৌজার সব সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবে প্রদান করেন। এতে গোপীনাথপুর মন্দিরটি নির্মিত হয়। পাল যুগের নির্মাণ কৌশলে মন্দিরটির কাঠামো নির্মিত।
১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এ মন্দিরটি ভেঙে পড়ে। এরপর ১৯২৮ থেকে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বর্তমান মূল মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করা হয়। এখনো পুরাতন কারুকার্যের কিছু নমুনা মূল ভবনে বিদ্যমান। মন্দিরটির উচ্চতা ১৫ মিটার (৫০ ফুট)। এখানে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আরতি এবং মধ্যাহ্নে আধা মণ চালের অন্নভোগ দেওয়া হয়। প্রতিবছর দোল পূর্ণিমাতে এখানে মেলা বসে এবং ১৩ দিনব্যাপী ধরে এ মেলা চলে। গোপীনাথপুরের এই মন্দির ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকা ঘিরে বার্ষিক মেলায় মৃৎশিল্প, হস্তশিল্প, কারুপণ্যসহ নানারকম তৈজসপত্রের কেনাবেচা হয়ে থাকে। স্থানটি পিকনিক স্পট হিসেবেও খ্যাতি লাভ করেছে।
লকমা জমিদার বাড়ি
জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার পশ্চিমে কাড়িয়া বাজারের কাছে ঐতিহাসিক লকমা জমিদার বাড়ি অবস্থিত। বাড়িটি বর্তমানে লকমা চৌধুরীর পরনাতীসহ উত্তরাধিকারী ও স্থায়ী বাসিন্দা সমন্বয়ে গঠিত ৪২ সদস্যের একটি সমিতি দেখাশুনা করে। জানা যায়, লকমার জমিদার একজন মুসলিম ছিলেন। তার জমিদারির মূল অংশ সীমান্তের ওপারে ছিল যা এই অংশে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
ধারণা করা হয়, প্রায় দু’তিনশ বছর পূর্বে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৫ বিঘা (৫ একর) জমি আছে। যেখানে বিভিন্ন শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি ফল ও ফুলের বাগান দেখা যায়। স্থানীয়দের মতে, এখানে একটি ঘোড়াশাল ও একটি হাতিশাল ছিল। তার একটু সামনে মাটির একটি ঢিবিতে ইউ আকৃতির বহু পুরাতন একটি ত্রিতল ভবন রয়েছে। ভবনের কিছুটা অংশ মাটির নিচে দেবে গেছে। জমিদার বাড়িতে মোট ১৭টি কক্ষ রয়েছে। লকমা রাজবাড়ির পূর্ব পার্শ্বে কর্মচারীর ঘর ও কবরস্থান রয়েছে। এখনো প্রতিদিন অনেক লোক রাজবাড়িটি দেখার জন্য আসেন।
জয়পুরহাট চিনি কল
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের জেলা শহর জয়পুরহাটে ১৯৬৩ সালে জয়পুরহাট সুগার মিলস লি. প্রতিষ্ঠিত হয়। আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের বৃহৎ চিনিকল। সুগার মিল স্থাপনের পর কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। এর ফলে ১৯৭৯ সালে জয়পুরহাট থানা থেকে মহকুমা এবং ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয়। ১৯৭২ সালে চিনি শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণ করা হয়।
বর্তমানে জয়পুরহাট চিনিকল বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের আওতাধীন একটি বাণিজ্যিক শিল্প প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে ৫৫ জন কর্মকর্তাসহ প্রায় এক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত। এই মিলের বার্ষিক চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ১২,৫০০ মেট্রিক টন। চিনি উৎপাদন ছাড়াও এখানে উপজাত হিসেবে চিটাগুড়, ব্যাগাস (আখের ছোবড়া) ও প্রেসমাড উৎপন্ন হয়ে থাকে। (চিটাগুড় গো-খাদ্য হিসেবে, ব্যাগাস পেপার মিলের কাঁচামাল হিসেবে এবং প্রেসমাড জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়)। মৌসুম চলাকালীন আখের ছোবড়ার মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে মিল কলোনিসহ মিলের ভারী যন্ত্রপাতি চালানো হয়।
শিশু উদ্যান
জয়পুরহাট শিশু উদ্যান জয়পুরহাট শহর থেকে এক কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বুলুপাড়ায় অবস্থিত। জয়পুরহাটের একজন প্রকৃতিপ্রেমী ব্যক্তি রফিকুল ইসলাম চৌধুরী (প্রিন্স) নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছেন এই রিজোর্ট। রিজোর্ট-এর পাশাপাশি এখানে একটি শিশু উদ্যান রয়েছে। পুরো উদ্যানের দেয়াল অলংকৃত হয়েছে বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা এবং ছবি দিয়ে। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন জীবজন্তুর আঁকা ছবি ও ভাস্কর্য। তাছাড়া উদ্যানেই গড়ে তোলা হয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা। সেখানে হরিণ, দোয়েল, কোয়েল, শ্যামা, ময়না, সজারু দেখতে পাওয়া যাবে।
উদ্যানে তিনটি পুকুর রয়েছে। শাপলা ফুলের পুকুরসহ অন্য পুকুরেও পা ও হস্তচালিত এবং ইঞ্জিনচালিত বোট রয়েছে। পুকুরের নিকটেই তৈরি করা হয়েছে গুহা। যেখানে আদিম যুগের মানুষের বসবাস সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ভালুক, জলহস্তিসহ বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য রয়েছে।
উদ্যানে ছোট পরিসরে একটি আমবাগান রয়েছে। এখানে সাজিয়ে রাখা আছে খ্যাতিমান বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিকদের ভাস্কর্য। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, চরকি, টয়ট্রেন, সুইমিং পুল ও দোলনাসহ বিভিন্ন রাইড আছে। এছাড়া বনভোজনে আসা মানুষদের জন্য কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে।
পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমি
পাগলা দেওয়ান বধ্যভূমিটি জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে ১৫ কিমি. দূরে জয়পুরহাট সদর উপজেলার চকবরকত ইউনিয়নের পাগলা দেওয়ান গ্রামে অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর তৎকালীন স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের প্ররোচনায় কোনোরকম উস্কানী ছাড়াই পাকসেনারা ১২২ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নৃশংসভাবে হত্যা করে। উক্ত স্থানে গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।
এসব উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান ছাড়াও দেখতে পারেন আছরাঙ্গা দিঘি, নান্দাইল দিঘি, হারুঞ্জা ধাপ বা হযরত মাহ কালাম (র.) এর মাজার, মহাপুন্য স্নান ও শিব মেলা, গোপীনাথপুরের ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার মেলা।
ভ্রমণের প্রস্তুতি:
পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও ছোট কিছু ভুল আপনার আনন্দময় ভ্রমণকে বিব্রতকর করে তুলতে পারে। তাই ভ্রমণকে আরো উপভোগ্য এবং স্মরণীয় করে তুলতে কিছু প্রস্তুতি অবশ্যই প্রয়োজন। ভ্রমণের প্রস্তুতির জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মাথায় রাখতে পারেন।
লিস্ট তৈরি করা
ভ্রমণের সময় আপনি কী কী করবেন এই পরিকল্পনাগুলো লিখে ফেলুন। এতে করে আপনার ভ্রমণের সময় যথাযথ ব্যবহার করা যাবে। লিস্ট অনুযায়ী ঠিক করুন কোথায় কোথায় যাবেন এবং সেখানে কত সময় অতিবাহিত করবেন।
হালকা লাগেজ
লাগেজ যতটা সম্ভব হালকা রাখার চেষ্টা করুন। অপ্রয়োজনীয় জিনিস এড়িয়ে চলুন। তাহলে আপনি খুব সহজেই ব্যাগ বহন করতে পারবেন। অন্যথায় ভারী ব্যাগ আপনার ভ্রমণকে তিক্ত করে তুলতে পারে।
সঠিকভাবে প্যাকিং
স্যান্ডেল বা জুতা পলিথিন বা কাগজে মুড়িয়ে ব্যাগে নিন এতে কাপড় ও অন্যান্য জিনিস পত্র নোংরা হবে না। এ জাতীয় ছোট ছোট বিষয়ে খেয়াল রাখুন।
স্থানীয় খাবার
ভ্রমণে যতটুকু সম্ভব স্থানীয় খাবার খাবেন এবং সেই খাবারের স্বাদ বুঝতে চেষ্টা করবেন। আপনি যদি ঘুরতে গিয়ে নিয়মিত রেস্টুরেন্টে খাবার খান তাহলে আপনার ঘুরতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। তাই ট্যুরিস্ট রেস্টুরেন্ট এড়িয়ে স্থানীয় লোকজন যেখানে খায় সেখানে খাবার চেষ্টা করুন।
অফ-সিজন ভ্রমণ
ভ্রমণ মৌসুমের বাইরে ভ্রমণ করলে খরচ কমে আসবে। অফ সিজনে সাধারণত পর্যটক কম থাকে। তাই হোটেল থেকে শুরু করে পরিবহন ও খাবার প্রায় সব জায়গাতেই আপনি কম খরচে চলতে পারবেন। তাই অফ সিজনে ভ্রমণ পরিকল্পনা করুন।
যাতায়াতের ব্যবস্থা
ভ্রমণের স্থানের অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে নিন। কারণ এসব ভ্রমণে আমাদের সবচেয়ে বেশি ঠকতে হয় স্থানীয় যানবাহন ভাড়া নিয়ে। ভাড়া সম্পর্কে ধারণা না থাকলে গাড়িচালকরা আপনার থেকে অতিরিক্ত ভাড়া চাইবেন।
অতিরিক্ত টাকা
ভ্রমণে সবসময় আপনার বাজেটের বাইরে কিছু টাকা সাথে রাখুন। যেকোনো সময় যেকোনো বিপদে এই অতিরিক্ত টাকা আপনাকে হেল্প করবে। আপনি চাইলে মোবাইল ব্যাংকিং বা ডেবিট ক্রেডিট কারডের মাধ্যমে কিছু অতিরিক্ত টাকা সাথে রাখতে পারেন।
ছোট ব্যাগ
ভ্রমণে মোবাইল, মানিব্যাগ ও ছোট ছোট দরকারি জিনিসপত্র রাখার জন্য ছোট একটি ব্যাগ সঙ্গে রাখুন। কিছু ব্যাগ পাওয়া যায় যেটি কোমরে রাখা যায়।
চার্জার
মোবাইল ও ল্যাপটপের চার্জার নিতে ভুলবেন না। পাওয়ার ব্যাংক হলে সবচেয়ে ভালো হয়। রুমের বাইরে যাবার সময় পাওয়ার ব্যাংকটি সঙ্গে নিতে পারেন। ছবি তোলার ক্ষেত্রে মোবাইলের চার্জ অনেক বেশি খরচ হয়। তাই পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখা নিরাপদ।
ইয়ারফোন
ভ্রমণের সময় কাটানোর জন্য ইয়ারফোন বা এমপিথ্রি প্লেয়ার সঙ্গে নিতে পারেন। ছোট মাপের কোনো স্পিকার সঙ্গে নিতে পারেন। এতে করে গ্রুপের সবাই একসঙ্গে গান শুনতে পারবেন এবং একটি ভালো আড্ডা জমে উঠবে।
ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন:
ঢাকার গাবতলী বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বাসে এবং কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে করে জয়পুরহাট যেতে পারেন।
বাস: ঢাকা থেকে জয়পুরহাট রুটের নন এসি বাস ভাড়া হলো সর্বনিম্ন ৬০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা এবং ঢাকা টু জয়পুরহাট রুটের এসি বাসের ভাড়া ৭০০ (সর্বনিম্ন) থেকে ১,৩০০ টাকা (সর্বোচ্চ)।
ঢাকা থেকে বগুড়া রুটে নিয়মিত যে সকল বাস যাতায়াত করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— এস আর ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, যমুনা লাইন, শ্যামলী এন আর ট্রাভেলস, আহাদ এন্টারপ্রাইজ, অরিন ট্রাভেলস পরিবহন। সহজ ডট কমের মাধ্যমে অনলাইনে পেয়ে যাবেন বিভিন্ন বাসের টিকিট। টিকিট কাটতে এখানে ক্লিক করুন। এছাড়া বাসের নিজস্ব ওয়েবসাইটে গিয়েও টিকিট কাটতে পারেন।
ট্রেন: রেলপথে এ জেলায় রয়েছে জয়পুরহাট রেলওয়ে স্টেশন। যা রেলপথে সারাদেশের সাথে জয়পুরহাটের যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। ঢাকা অভিমুখী আন্তঃনগরগুলো হলো— একতা, দ্রুতযান, নীলসাগর, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ও চিলাহাটি এক্সপ্রেস। ট্রেনের টিকিট কাটতে এখানে ক্লিক করুন।
যেখানে থাকবেন:
হোটেল প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল
ঠিকানা: সিও কলোনী, সদর রোড, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭৭৭৬৫৫৮৫৮
হোটেল শাপলা
ঠিকানা: কলেজ রোড শান্তিনগর, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৯৫৪০৬২৫৫০
হোটেল আমিন
ঠিকানা: শান্তিনগর স্টেশন রোড, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৯১৬-৩১৬০৮১
হোটেল সৌরভ
ঠিকানা: থানা রোড, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭১৩৪৭৯৫৫২
হোটেল বৈশাখী
ঠিকানা: সদর রোড, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭১৬৬৫২৯৪৪
হোটেল জাহানারা ইন্টারন্যাশনাল
ঠিকানা: জাহানারা প্লাজা, সদর রোড,জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭৫৯৯৪৬৬৬২
মোল্লা টাওয়ার
ঠিকানা: নিউ মার্কেট, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭৩৮২৭১৮১৮
হোটেল সা’দ ইন্টারন্যাশনাল (আবাসিক)
ঠিকানা: ০১ নং স্টেশন রোড, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭২১৯০৪৪৮৮
হোটেল পৃথিবী ইন্টারন্যাশনাল (আবাসিক)
ঠিকানা: সদর রোড, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭০২৫০১৯৫১
হোটেল আল জাসিম
ঠিকানা: ০২ স্টেশন রোড, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭৩৫০৫৪৩৪০
হোটেল তাজ (আবাসিক)
ঠিকানা: কলেজ রোড, জয়পুরহাট
মোবাইল: ০১৭২৫৭৩৫১০৭
যা খাবেন
জয়পুরহাটে বিভিন্ন মানের চাইনিজ এবং বাংলা খাবারের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এদের মধ্যে ক্যাফে অরেঞ্জ চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, রুচিটা রেস্টুরেন্ট এন্ড চাইনিজ, মিনা, প্রিন্স রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া জয়পুরহাটের চটপটি খুবই বিখ্যাত। জয়পুরহাটের প্রত্যেকটি অলিতে গলিতে দেখা মিলবে ছোট বড় চটপটির দোকান। তবে এটি বিশেষ কেননা- বেশ কয়েক প্রকার মসলার কম্বিনেশনে তৈরি করা হয় এ মুখরোচক খাবার। এছাড়াও জয়পুরহাটে চটপটির দোকানগুলোতে বিশেষ মসলা ব্যবহার করা হয় যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এই অনন্য স্বাদ। জয়পুরহাটে যে কয়েকটি চটপটির দোকান রয়েছে তার মধ্যে অন্নপূর্ণা চটপটি,ফুচকা এন্ড কফি হাউস অন্যতম।
জয়পুরহাটে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বিসমিল্লাহ হোটেল। এখানকার গরুর মাংস ভুনা ও বিফ চপ বেশ বিখ্যাত। জয়পুরহাটে রয়েছে বিখ্যাত শর্মা মিষ্টির দোকান। এখানকার হাড়িভাঙ্গা মিষ্টি খেতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে একবার হলেও আসতে হবে।
সতর্কতা:
ইট-পাথরের শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে ভ্রমণের জন্য আকুল থাকে মন। তবে একটু সতর্কতা অবলম্বন করলে ভ্রমণ হয়ে উঠবে আরো আনন্দময়। ভ্রমণে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে—
পরিকল্পিত ভ্রমণ
পরিকল্পিতভাবে ভ্রমণ করলে যাত্রা আরামদায়ক ও নিরাপদ হয়। যদি বাস বা ট্রেনের টিকিট বুকিং করার সুযোগ থাকে, তাহলে মাঝামাঝি আসন নিন। রাতের বেলায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে জানালার পাশে বা বাসের খুব পেছনের আসন এড়িয়ে চলাই ভালো।
নির্ভরযোগ্য যানবাহন ব্যবহার
নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য বাস বা যানবাহন বেছে নিন। সরকারি বা স্বীকৃত পরিবহন সংস্থার যানবাহন ব্যবহার করুন। বাস বা গাড়ির রুট ও সময়সূচি সম্পর্কে আগেই জেনে নিন। অ্যাপ-ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং পরিষেবা (যেমন উবার, পাঠাও) ব্যবহার করলে গাড়ির তথ্য যাচাই করুন।
নিজের অবস্থান গোপন রাখুন
বর্তমান যুগে অনেকেই নিজের দৈনন্দিন কার্যকলাপ এবং ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। যারা সন্ধ্যার পর বা রাতে ভ্রমণ করেন তাদের জন্য এটি ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। অপরিচিতদের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবেন না। যদি সম্ভব হয়, যাত্রাপথের লাইভ লোকেশন পরিবার বা বন্ধুকে শেয়ার করুন।
চারপাশ পর্যবেক্ষণ করুন
অপরিচিত বা সন্দেহজনক ব্যক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত কথা বলা বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করা এড়িয়ে চলুন। ব্যস্ত থাকলেও মোবাইলে পুরোপুরি মনোযোগ দেবেন না, চারপাশের পরিস্থিতি লক্ষ্য রাখুন। সন্দেহজনক কিছু দেখলে বা অনুভব করলে বাসচালক বা সহযাত্রীদের জানান।
ভিড় এড়িয়ে চলুন
খুব বেশি ভিড় থাকলে বা সন্দেহজনক পরিস্থিতি দেখলে সেই যানবাহনে না ওঠাই ভালো। গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র যেমন মানিব্যাগ, ফোন বা ব্যাগ নিজের কাছেই রাখুন।
আত্মরক্ষায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে রাখুন
প্রয়োজনে আত্মরক্ষার জন্য ছোটখাটো সরঞ্জাম (যেমন: পেপার স্প্রে, হুইসল, ফোল্ডিং মেটাল সেফটি রড, ইত্যাদি ) সঙ্গে রাখতে পারেন। ফোনের ব্যাটারি ও মোবাইল ডাটা চালু রাখুন, যাতে প্রয়োজনে সাহায্য চাইতে পারেন।
জরুরি নম্বর সংরক্ষণ করুন
স্থানীয় পুলিশ, বাস সার্ভিস হেল্পলাইন ও পরিচিতজনের নম্বর সহজেই পাওয়া যায় এমন জায়গায় রাখুন। বিপদের সময় ৯৯৯ (বাংলাদেশের জরুরি সেবা) তে কল করুন।
যাত্রাপথে অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া কিছু খাবেন না
যাত্রাকালে অনেক যাত্রী পার্শ্ববর্তী যাত্রীকে ভদ্রতার খাতিরে বা বন্ধুসুলভভাবে খাদ্য-পানীয় গ্রহণে অনুরোধ করেন। যাত্রীর ছদ্মবেশে অনেক সময় মলম পার্টির লোকেরা খাবারে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে দেয়। এই খাবার গ্রহণের পর যাত্রীরা অচেতন হয়ে পড়লে তারা সর্বস্ব লুটে নেয়। এধরণের পরিস্থিতিতে ঝুঁকি এড়াতে অপরিচিত ব্যক্তির দেয়া কিছু না খাওয়া নিরাপদ।
মোবাইল ফোন নিরাপদে রাখুন
অনেকেই বাসে বা গণপরিবহনে যাত্রাকালে মোবাইল ফোন বের করে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং করেন। এ ধরনের অভ্যাস ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে জানালার পাশে বসলে খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ফোন বের না করে নিরাপদ। সম্ভব হলে, যাত্রা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফোন বের না করে, নিরাপদে পকেটে বা ব্যাগে রাখুন।